মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদ নলিনী বাগচী স্মরণে। #সুমিত ঘোষ।।

3rd July 2021 11:22 pm মুর্শিদাবাদ
মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদ নলিনী বাগচী স্মরণে। #সুমিত ঘোষ।।


#মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী শহীদ নলিনী বাগচী স্মরণে।
#সুমিত ঘোষ।।

#ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বহু বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতের যে সকল রাজ্যে এই সমস্ত বৈপ্লবিক কার্যকলাপ বিশেষ ভাবে সক্রিয় ছিল, তার মধ্যে অবিভক্ত বাংলা ছিল অন্যতম। বাংলার এই সকল বৈপ্লবিক কর্মকান্ড বিভিন্ন গুপ্ত সমিতির দ্বারা পরিচালিত হত। ব্রিটিশ শাসকদের প্রবল দমন পীরণ মূলক নীতি এই সকল বিপ্লবীদের মনোবল ও কর্মকান্ডকে কোনো ভাবেই দমিয়ে রাখতে পারেনি। বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে তাঁরা যে কোনো মুহূর্তে নিজের জীবনের বলিদান দিতে প্রস্তুত ছিলেন। এই সকল বিপ্লবীদের মধ্যে ধুলিয়ান-কাঞ্চনতলার বিপ্লবী নলিনী বাগচী তাঁর বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের জন্য ইতিহাসের পাতায় চির স্মরণীয় হয়ে আছেন। 

১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দে কাঞ্চনতলায় নলিনী বাগচী জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতা ছিলেন ভুবনমোহন বাগচী । তিনি কর্মসূত্রে নদীয়া জেলার শিকারপুর থেকে কাঞ্চনতলা আসেন । নলিনীর বাল্যকালেই তার পিতার মৃত্যু হয় । তাঁর ডাক নাম ছিল পচা । ছাত্রজীবনের প্রথম ভাগ কাঞ্চনতলা জে ডি জে ইনস্টিটিউশন এবং পরে পাকুড় হাইস্কুলে অতিবাহিত করেন । পাকুড় হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন । তারপরে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে আই. সি . পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন । 
     নলিনী বাগচী অনুশীলন সমিতির সক্রিয় সদস্য ছিলেন । তিনি বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুশীলন সমিতির শাখা গড়ে তোলেন । ১৯১৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে পুলিশের খাতায় তিনি ফেরার ছিলেন । ১৯১৭ সালে বালেশ্বরের খণ্ড যুদ্ধের পর সরকারী দমন নীতি প্রচন্ড রূপ ধারণ করলে বাংলার বিপ্লবীদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করতে হয় । নলিনী ও তার সহকর্মীরা পুলিশের ‌শ‍্যেন দৃষ্টি এড়াবার জন্য আসামের গৌহাটি শহরের একপ্রান্তে গোপন আস্তানা স্থাপন করেন । কিন্তু , একদিন এই গোপন আস্তানার খবর পেয়ে পুলিশ অফিসার ফেয়ারওয়েদার-এর নেতৃত্বে শীতের এক শেষ রাতে তাদের ঘেরাও করা হয় । শুরু হয় দু'পক্ষের তুমুল সংগ্রাম । একদিকে আধুনিক অস্ত্র সজ্জিত ব্রিটিশ বেতনভুক্ত কর্মচারীর দল , অন্যদিকে মাতৃমন্ত্রে দীক্ষিত কিছু নির্ভীক যুবক , যাদের সম্বল বলতে গুটিকয় রাইফেল ও পিস্তল । এই পরিস্থিতিতে পুলিশের দুর্ভেদ্য বেড়াজাল ভেদ করে নলিনী বাগচী ও প্রবোধ দাশগুপ্ত পলায়নে সক্ষম হন । তারপর নলিনী বাগচী শ্বাপদসঙ্কুল অরন্যপথ পায়ে হেঁটে পার হয়ে অত্যান্ত অসুস্থ অবস্থায় কলকাতা উপস্থিত হন । তখন তার সারা শরীর গুটিবসন্তে ছেয়ে গেছে ।  জ্বরে বেহুঁশ অবস্থায় গায়ে কম্বল ঢাকা দিয়ে গড়ের মাঠে পড়ে রইলেন । এই সময় বিপ্লবী সতীশচন্দ্র তাকে চিনতে পেরে কোলকাতায় গোপন আস্তানায় সেবা - শুশ্রুষা করে সুস্থ করে তোলেন । এরপরে তিনি বাংলার বিপ্লবী কর্মধারায় গতি আনার জন্য পূর্ব বাংলা বিপ্লবী সংগঠনের দায়িত্ব নিয়ে ঢাকায় চলে যান । ঢাকায় কলতা বাজারে তিনি গোপন আস্তানা গড়ে তোলেন । বিপ্লবী তারিণী মজুমদার তার সঙ্গে সেখানে যোগাদান করেন । সেই সময় ব্রিটিশরা মরিয়া হয়ে উঠেছে বিপ্লবীদের উৎখাত করার জন্য । তাই এই গোপন আস্তানা আর বেশি দিন গোপন রইল না । একদিন পালাবার সমস্ত পথ অবরুদ্ধ করে বিশাল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী তাদের ঘেরাও করে ফেলে । এই অসম সংগ্রাম -এ বাংলার দুই নির্ভীক বীরের মতো লড়াই চালিয়ে যান । তারিণী মজুমদার পুলিশের গুলিতে নিহত হলেও তিনি এককভাবে দক্ষতার সাথে লড়াই চালিয়ে যান । এক সময় সর্বাঙ্গে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রক্ত আবীরে আপ্লুত হয়ে নলিনী বাগচী পুলিশের হাতে ধরা পড়েন । 
      এমত অবস্থায় পুলিশ তার প্রকৃত পরিচয় জানার জন্য একাধারে প্রলোভন ও নির্যাতন চালিয়ে যেতে থাকে । প্রত্যুত্তরে তিনি গর্জে উঠে বলেছিলেন , "Stop Dog , don't Disturb me . Let me die in peace."   নলিনী বাগচী চান নি কোনো খ্যাতি, কোনো যশ বা কোনো গৌরবগাথার নায়ক হতে । নিঃশব্দে তার কর্তব্য শেষ করে বাংলার বিপ্লবী কর্মধারাকে উজ্জীবিত করে ১৯১৮ সালের ১৫ জুন ( মতান্তরে ১৬ ই জুন অমৃতলোক যাত্রা করেন । 

প্রসঙ্গত ধুলিয়ান-সামসেরগঞ্জ এলাকার নিমতিতা-জগতাই গ্রামের নলিনীকান্ত সরকারের কাছে বহু বিপ্লবী আত্মগোপন করার উদ্দেশ্যে আসতেন। নলিনী কান্ত সরকার ছিলেন একজন গায়ক, সাহিত্যিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি ছিলেন বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের বিশেষ বন্ধু ও দাদা ঠাকুর বা শরৎ পন্ডিতের ভাব শিষ্য। নলিনী কান্ত সরকার ঐ সমস্ত বিপ্লবীদের নাম বদলে নিমতিতা হাই স্কুলে ভর্তি করে দিতেন যাতে তাদের পরিচয় কেউ না জানতে পারেন। কিন্তু নিমতিতা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক যোগিবর বরদাচরণ মজুমদার (যিনি ছিলেন নজরুল ইসলামের যোগগুরু) যোগবলে সবই জেনে যান। নলিনী বাগচী ও নলিনীকান্ত সরকারের সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল কিনা তা জানা যায় না। যদিও বা থাকে তা বলা প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ বিপ্লবীরা তাদের কার্যকলাপ গোপন রাখতেন। 

#সুমিত ঘোষ।
#তথ্যসূত্র: ১.অগ্নি যুগের কাহিনী, সতীশ চন্দ্র পাকরাশী, ২. শহীদ নলিনী বাগচী, আশীষ কুমার মণ্ডল, বুক হাউস বহরমপুর, ১৯৯৭, ৩.আসা যাওয়ার মাঝখানে, নলিনকান্ত সরকার, ৪. ধুলিয়ান ইতিবৃত্ত, সুমিত ঘোষ।
#ছবি: রাজ্য লেখ্যাগার থেকে প্রাপ্ত।
#উৎসর্গ: আমার প্রাণের ধুলিয়ানের সুধী বাসিন্দাগণ।
#উৎসাহ: চুন্নু সিং (রামকৃষ্ণ সিং)।

(Copy- Sri Sumit Ghosh)





Others News